শনিবার ২ মে ২০২৬ - ১১:৫৪
যুদ্ধক্ষেত্র থেকে কূটনীতি: ইরানের সামরিক সাফল্যে বিবর্ণ মার্কিন শক্তির মর্যাদা

নিউ ইয়র্ক টাইমসের স্বীকারোক্তি: হরমুজ থেকে ভিয়েনা পর্যন্ত সব ফ্রন্টেই ইরান এগিয়ে, যুক্তরাষ্ট্র পতনের পথে।

হাওজা নিউজ এজেন্সি রিপোর্ট অনুযায়ী, বিশ্বের সবচেয়ে শক্তিশালী সামরিক শক্তি হিসেবে পরিচিত যুক্তরাষ্ট্রের সেনাবাহিনী যে দীর্ঘদিন ধরেই কাঠামোগত দুর্বলতা ও অপারেশনাল পতনের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে-এই বাস্তবতা আর গোপন রাখতে পারলেন না আমেরিকার অন্যতম নামকরা সংবাদমাধ্যম নিউ ইয়র্ক টাইমস। তাদের প্রকাশিত এক বিস্তারিত প্রতিবেদনে স্পষ্ট ভাষায় বলা হয়েছে, ইরানের বিরুদ্ধে সাম্প্রতিক যুদ্ধ পরিস্থিতি যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক সক্ষমতার সীমাবদ্ধতাকে বিশ্বের সামনে উন্মোচিত করে দিয়েছে।

হরমুজ প্রণালী এখন ইরানের নিয়ন্ত্রণে

প্রতিবেদনটিতে বলা হয়েছে, কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালী-যার মধ্য দিয়ে বিশ্বের তেলের এক-পঞ্চমাংশ পরিবহিত হয়-ইরান এখন কার্যকরীভাবে নিজের নিয়ন্ত্রণে রেখেছে। আমেরিকা ও তার মিত্র নৌবহর সেখানে ইচ্ছামতো টহল দিয়ে প্রভাব বিস্তার করতে পারছে না। বরং ইরানের বিপুল সংখ্যক ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন বাহিনী সেই জলসীমায় যেকোনো সময় যে কোনো লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানতে সক্ষম-যা অঞ্চলে অবস্থানরত মার্কিন মিত্র দেশগুলোর জন্য এক অব্যাহত হুমকির নাম।

ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্রে আধুনিক যুদ্ধে পিছিয়ে আমেরিকা

নিউ ইয়র্ক টাইমস আরও উল্লেখ করেছে, ইরানের যুদ্ধ কৌশল মার্কিন সেনাবাহিনীর প্রযুক্তিগত ও কৌশলগত ফাঁকগুলোকে স্পষ্ট করে দিয়েছে। আমেরিকা এখনও বড় বড় প্রচলিত অস্ত্র ও বিমানবহরের ওপর নির্ভরশীল, অথচ ইরান সাশ্রয়ী মূল্যের ড্রোন ও সুপারসনিক ক্ষেপণাস্ত্র দিয়ে আধুনিক যুদ্ধের একটি নতুন সমীকরণ দাঁড় করিয়ে দিয়েছে। বিশেষ করে ইরানের ‘শাহেদ’ ও ‘আবাবিল’ সিরিজের ড্রোনগুলি মার্কিন প্রতিরক্ষাব্যবস্থাকে বহুবার হটিয়ে দিতে সক্ষম হয়েছে।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, আমেরিকা নিজেকে আধুনিক যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত রাখতে ব্যর্থ হয়েছে। ড্রোনযুদ্ধ, সাইবার আক্রমণ এবং অপ্রতিসম কৌশল যেখানে প্রধান হয়ে উঠেছে, সেখানে আমেরিকার পুরোনো সামরিক কাঠামো গতিশীলতার অভাবে বারবার বিপর্যস্ত হচ্ছে।

আলোচনার টেবিলেও ইরানের শক্ত অবস্থান

শুধু যুদ্ধক্ষেত্রেই নয়, কূটনৈতিক মঞ্চেও ইরান অভূতপূর্ব শক্তি প্রদর্শন করছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, পরমাণু চুক্তি ও আঞ্চলিক স্থিতিশতা নিয়ে ভিয়েনা বা দোহায় অনুষ্ঠিত আলোচনায় ইরান আগের চেয়ে অনেক বেশি দৃঢ় ও আত্মবিশ্বাসী অবস্থান নিয়েছে। তারা এখন আর নিঃশর্ত ছাড় দিতে রাজি নয়; বরং মার্কিন নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার, অর্থনৈতিক নিশ্চয়তা এবং লেবানন ও সিরিয়ায় তাদের প্রভাব স্বীকার করার মতো শর্ত জুড়ে দিয়েছে-যা ওয়াশিংটনের জন্য মেনে নেওয়া কঠিন হয়ে পড়েছে।

বিশ্লেষকরা যা বলছেন

মধ্যপ্রাচ্য বিষয়ক বিশ্লেষকদের মতে, ইরান যে কেবল যুদ্ধে টিকে থাকে তাই নয়, বরং তা থেকে কৌশলগত সুবিধা আদায়ে সক্ষম-এটাই যুক্তরাষ্ট্রের জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। অন্যদিকে, আফগানিস্তান ও ইরাক থেকে সেনা প্রত্যাহার, ইউক্রেন ও গাজায় অস্ত্র সরবরাহের চাপ এবং অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক সংকট মার্কিন সামরিক সক্ষমতাকে কয়েক দশকের মধ্যে সবচেয়ে দুর্বল অবস্থায় ফেলেছে।

পেন্টাগনের নীরবতা

এই প্রতিবেদন প্রকাশের পর পেন্টাগন এখন পর্যন্ত আনুষ্ঠানিক কোনো জবাব দেয়নি। তবে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক কর্মকর্তা সংবাদমাধ্যমকে বলেন, আমাদের সামরিক শক্তি এখনও অপ্রতিদ্বন্দ্বী, তবে কৌশলগত কিছু পুনর্মূল্যায়নের প্রয়োজন আছে।

সব মিলিয়ে, নিউ ইয়র্ক টাইমসের এই স্বীকারোক্তি মধ্যপ্রাচ্যের শক্তির ভারসাম্যে একটি বড় ধাক্কা বলে মানছেন পর্যবেক্ষকরা। আর ইরানের সামরিক ও কূটনৈতিক কৌশল যে বর্তমান বিশ্ব পরিস্থিতিতে অত্যন্ত কার্যকর-তা এখন আর কেবল ইরানের দাবি নয়, বরং আমেরিকার নামকরা গণমাধ্যমেও স্বীকৃত।

Tags

আপনার কমেন্ট

You are replying to: .
captcha